Posts Tagged ‘CPI(M)’

বামফ্রন্ট সরকারের ৩৩ বছরে জ্যোতি বসুর পরামর্শ

জুলাই 5, 2009

 

মানুষের ওপর ভরসা রাখুন,

শুধরে নিন নিজেদের ভুল

 

এরাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার স্থিতিশীল, শান্তির পরিবেশ এবং জনমুখী উন্নয়নের নজির তৈরি করে গোটা দেশের সামনে একটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম তুলে ধরেছে। রাজ্যের মানুষ এটা দেখেছেন, তাই তাঁরা প্রতিটি নির্বাচনে বামফ্রন্টকেই বেছে নিয়েছেন। এটা ঠিকই যে গত লোকসভা নির্বাচনে একটা ব্যতিক্রমী ফলাফল হয়েছে। কেন এমন হলো তার জন্য আমাদের গভীর আত্মসমীক্ষা করতে হবে। আমি শুধু একটা কথাই বলবো, মানুষের ওপরে আমরা যেন ভরসা না হারাই। কারণ মানুষই ইতিহাস রচনা করেন। সাময়িকভাবে হয়তো কেউ হয়তো ভুল বুঝতে পারেন, কিন্তু আমরা যদি সেই মানুষের কাছে বারবার যাই, তাঁদের ভালোবাসার যোগ্য হয়ে উঠি, তবে তাঁরা নিশ্চয়ই আমাদের বুঝবেন। গত পঞ্চায়েত ও লোকসভা নির্বাচনে আমাদের বিরুদ্ধে যারা চলে গেছেন, তাঁদেরকে আবার আমাদের দিকে টেনে আনতে হবে। শুধু তাঁদেরই নয়, আরো নতুন নতুন মানুষকেও টেনে আনতে হবে। পাশাপাশি নিজেদের যে ভুল আছে তাও শুধরে নিতে হবে। বামফ্রন্ট সরকারের ৩৩ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে গণশক্তিকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে একথা বললেন জননেতা জ্যোতি বসু। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ‌অজয় দাশগুপ্ত।

 

 

 

 

 

প্রশ্ন : আজ এরাজ্যে বামফ্রন্ট সরকারের ৩২বছর পূর্ণ হচ্ছে। এই উপলক্ষে রাজ্যবাসীর কাছে আপনার বার্তা কী?

জ্যোতি বসু : রাজ্যের  সমস্ত মানুষকে আমার শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। ১৯৭৭সালে এরাজ্যে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে টানা সাতবার বিধানসভা নির্বাচনে এরাজ্যের মানুষ বামফ্রন্টকেই জয়ী করে এসেছেন। এটা শুধু ভারতেই নয়, গোটা পৃথিবীর সংসদী‌য় গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটা ন‍‌জিরবিহীন ঘটনা। এই নজির গড়ার কৃতিত্ব এরাজ্যের সচেতন, সংগ্রামী মানুষেরই। আমি তাই এই উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে আমার অভিনন্দন, ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

প্রশ্ন: এরাজ্যের মানুষ যে এতদিন ধরে বামফ্রন্ট সরকারকে বেছে নিয়েছেন, তার পেছনে মূল কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?

জ্যোতি বসু: কারণ আমরা সবসময় মানুষের স্বার্থকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। আমরা যখন সরকারে এলাম, খুবই সীমিত আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা নিয়ে কাজ শুরু করতে হয়েছিলো। আজ এটা সবাই স্বীকার করবেন যে, এই সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার মানুষের স্বার্থে অনেক কাজ করতে পেরেছে। সরকারে আসার প্রথম দিনই আমরা ঘোষণা করেছিলাম, শুধু মহাকরণ থেকে এই বামফ্রন্ট সরকার চলবে না, সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমতা পৌঁছে দিতে হবে। পঞ্চায়েত এবং পৌরসভার মাধ্যমে গরিব সাধারণ মানুষের হাতে সেই ক্ষমতা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, বামফ্রন্ট সরকার গোটা দেশের সামনে মানুষের স্বার্থে বিকল্প কর্মসূচীর একটা নজিরও তুলে ধরতে পেরেছে।এরাজ্যে  বামফ্রন্ট সরকার স্থিতিশীল, শান্তির পরিবেশ এবং জনমুখী উন্নয়নের নজির তৈরি করে গোটা দেশের সামনে একটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম তুলে ধরেছে। রাজ্যের মানুষ এটা দেখেছেন, তাই তাঁরা প্রতিটি নির্বাচনে বামফ্রন্টকেই বেছে নিয়েছেন। আমরা যে এতদিন সরকারে রয়েছি, তা মানুষের ইতিবাচক রায়েই রয়েছি।

প্রশ্ন : কিন্তু গত লোকসভা নির্বাচনে আমরা দেখলাম ৩২ বছরে এই প্রথম একটি নির্বাচনে বিরোধীরা বামফ্রন্টের থেকে বেশি আসনে জয়ী হলো। তার আগে পঞ্চায়েত নির্বাচনেও বামফ্রন্টের ফল খারাপ হয়েছে। এই ঘটনাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

জ্যোতি বসু : হ্যাঁ , এটা ঠিকই যে গত লোকসভা নির্বাচনে একটা ব্যতিক্রমী ফলাফল হয়েছে। কেন এমন হলো তার জন্য আমাদের গভীর আত্মসমীক্ষা করতে হবে। আমাদের পার্টি, বামফ্রন্টের শরিক দলগুলি নির্বাচনী ফলাফলের বিস্তারিত পর্যালোচনা করছে। দিল্লিতে আমাদের পার্টির পলিট ব্যুরো ও কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক এখন চলছে। আলোচনা করে নিশ্চয়ই আমরা ভুল-ত্রুটিগুলি চিহ্নিত করতে পারবো।

প্রশ্ন : গত নির্বাচনে ফলাফল এরকম খারাপ হওয়ার পেছনে কি কি কারণ আছে বলে আপনার মনে হচ্ছে।

জ্যোতি বসু : আমাদের পার্টি বলেছে, এর পিছনে যেমন জাতীয় কারণ আছে, তেমনি রাজ্যের বা স্থানীয় কারণও রয়েছে। নির্বাচনে আমাদের যা বক্তব্য ছিল, কি আমরা করতে চাই, তা মানুষকে আমরা সঠিকভাবে বোঝাতে পারিনি। আমরা যেটা করতে চেয়েছিলাম, সেই তৃতীয় ফ্রন্টও কি হবে ‌অথবা কিভাবে হবে, তা মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়নি। আমরা যে বি জে পি-র মতো সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ঠেকাতে কংগ্রেসের নেতৃত্বে একটা জোট সরকারকে সাধারণ ন্যূনতম কর্মসূচী (সি এম পি)-র ভিত্তিতে সমর্থন করেছিলাম, মানুষ বুঝেছিলেন এটা খুবই জরুরী ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে  কংগ্রেস কথা রাখলো না, ওরা সি এম পি মানলো না। ওঁরা আমেরিকার তাঁবেদারি করার পথে এগোলো। তাই এই সমর্থন আমাদের তুলে দিতে নিতে হলো। কিন্তু মানুষকে এবিষয়ে আমাদের বক্তব্য আমরা বোঝাতে পারিনি। 

প্রশ্ন : আর এরাজ্যের ক্ষেত্রে কোন কারণগুলি নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে হয়।

জ্যোতি বসু : আমার মনে হয়, শিল্পের জন্য জমি নেওয়া হবে একথা বলায় মানুষ ভয় পেয়েছেন। আমাদের বিরুদ্ধে প্রচার করা হয়েছে, বামফ্রন্ট সরকার নাকি কৃষকের জমি কেড়ে নেবে। এসব অসত্য প্রচার মানুষের মধ্যে প্রভাব ফেলেছে। এরাজ্যে গ্রামের লক্ষ লক্ষ ভূমিহীন গরিব মানুষকে তো আমরাই ভূমিসংস্কার, অপারেশন বর্গা করে জমি দিয়েছি। কৃষির আরো উন্নতি করেই যে আমরা শিল্প করতে চাই, মানুষের উপলব্ধির মধ্যে তা আনতে পারিনি। কৃষিতে তো আমরা অনেক এগিয়েছি, খাদ্যে স্বনির্ভর হয়েছি। সারা দেশে কৃষি উৎপাদনে অনেকদিন ধরে আমরাই শীর্ষে। কিন্তু কৃষিক্ষেত্রে আরো উন্নতির সুযোগ রয়েছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহায্য নিয়ে আমাদের কৃষির মান আরো উন্নত করতে হবে, কৃষির এলাকা আরো ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে, সেকাজ আমরা করছিও। কিন্তু সেকথা মানুষের কাছে তুলে ধরা যায়নি।

প্রশ্ন : নির্বাচনে এরকম ফলাফলের প্রেক্ষিতে বামফ্রন্ট কর্মীদের এখন কী করণীয় বলে আপনি মনে করছেন?

জ্যোতি বসু : আমি শুধু একটা কথাই বলবো, মানুষের ওপরে আমরা যেন বিশ্বাস না হারাই। কারণ মানুষই ইতিহাস রচনা করেন। সাময়িকভাবে কেউ হয়তো ভুল বুঝতে পারেন, কিন্তু আমরা যদি সেই মানুষের কাছে বারবার যাই, তাঁদের ভালোবাসার যোগ্য হয়ে উঠি, তবে তাঁরা নিশ্চয়ই আমাদের বুঝবেন। গত পঞ্চায়েত ও লোকসভা নির্বাচনে আমাদের বিরুদ্ধে যারা চলে গেছেন, তাঁদেরকে আবার আমাদের দিকে টেনে আনতে হবে। শুধু তাঁদেরই নয়, আরো নতুন নতুন মানুষকেও টেনে আনতে হবে। পাশাপাশি নিজেদের যে ভুল আছে তাও শুধরে নিতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের চেতনা আছে, তাঁরা  অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে উপলব্ধি করেছেন কে শত্রু, কে মিত্র। আমার বিশ্বাস আছে, এরাজ্যের মানুষ কারা তাঁদের ভালো চায়, এরাজ্যকে অগ্রগতির পথে কারা নিয়ে যেতে চায়, কারা রাজ্যকে পিছিয়ে দিতে চাইছে, এটাও তাঁরা নিশ্চয়ই সঠিকভাবে উপলব্ধি করবেন। মানুষের জয় হবেই।

প্রশ্ন : আপনার নিজের কথা কিছু বলুন।

জ্যোতি বসু : আমার কথা কি আর বলবো, আর কদিন বাদেই আমার ৯৫ বছর বয়স হবে। ৭০বছরের বেশি সময় ধরে রাজনীতি করছি। কিন্তু আমি এখন অপারগ। এবারে তো অসুস্থতার জন্য ভোটও দিতে পারলাম না। তবে নির্বাচনের পর কাগজে একটা জিনিস দেখে আমার খুবই ভালো লাগলো। এখন যেসব ঘটছে, তা নিয়ে বামফ্রন্টের সভায় ঐক্যবদ্ধভাবে প্রস্তাব নেওয়া হয়েছে, বাইরেও সবাই একই সুরে কথা বলেছেন। কেউ কারো বিরুদ্ধে বলেননি। এটা একটা বড়ো বিষয়। অনেক আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে এরাজ্যে বামফ্রন্ট তৈরি হয়েছে। তাই বামফ্রন্টের ঐক্যকে আমাদের ‌অটুট রাখতেই হবে। এরাজ্যে জনগণের যে দূর্গ তৈরি হয়েছে, সেই ঐতিহ্যকে আমাদের অম্লান রাখতে হবে। এটাই আমার কথা। আমি আপনাদের সবাইকে আরেকবার অভিনন্দন জানাচ্ছি।

 

 

 

 

 

 

ARTICLE ON 20TH AUGUST GENERAL STRIKE

সেপ্টেম্বর 3, 2008

 

 

বিশ্বাসঘাতকতার জবাব দিচ্ছেন মানুষ

অজয় দাশগুপ্ত

 

কাঠগড়ায় কংগ্রেস। কাঠগড়ায় কংগ্রেসের নেতৃত্বে  ইউ পি এ সরকার।

২০শে তাই চার্জশিট দিয়েছেন দেশের মানুষ।

অভিযোগ বিশ্বাসঘাতকতার। অভিযোগ প্রতিশ্রতিভঙ্গের।

বিশ্বাসঘাতকতা ? বিশ্বাসঘাতকতা নয়!

কি রায় ছিল দেশের মানুষের? সাম্প্রদায়িকতার হিংস্র মুখটাকে কিছুদিন আড়ালে সরিয়ে রেখে ‘ঝক্‌মকে ভারত’-এর স্লোগান নিয়ে যারা মাঠে নেমেছিলেন, গত লোকসভা নির্বাচনে তাদের মানুষ সাফ রায় দিয়েছিলেন। দেশের অধিকাংশ মানুষের স্পষ্ট রায় ছিল এটাই, তোমাদের ‘সোনালী ভারত’ মানে আত্মহত‌্যা করা কৃষকের সারি সারি লাশ, তোমাদের ‘শাইনিং ইন্ডিয়া’-র অর্থ হলো গুজরাট গণহত‌্যা। ‘উজ্‌লা ভারত’-এর স্লোগানের আড়ালে তোমাদের দেশ বেচার ফন্দি, দুনিয়াজুড়ে দখলদারি কায়েমে আমেরিকার যুদ্ধজোটে ছোট শরিক হওয়া। দেশের লাভজনক সরকারী সংস্থা মুনাফালোভী দানব বহুজাতিকের হাতে তুলে দেওয়া, বিশ্বায়ন-বেসরকারীকরণ-নয়া উদারীকরণের ধ্বজা ওড়ানো। অতএব তোমরা আর না।

মানুষের খন্ডিত রায়ে বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে একমাত্র লড়াকু শক্তির স্বাধীনোত্তর ভারতের সংসদে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসনপ্রাপ্তি এবং একমাত্র তাঁদের সমর্থনেই দেশের সরকার গড়া সম্ভব, এমন পরিস্থিতির উদ্ভব। 

হ‌্যাঁ, এই প্রেক্ষাপটেই বামপন্থীদের সমর্থনে কংগ্রেসের নেতৃত্বে  ইউ পি এ-র সরকার গঠনের প্রস্তুতি। তখনও মনমোহন সিং-এর বাড়ির ঠিকানা ১৯, সফদরজং রোড থেকে পরিবর্তিত হয়ে ৭, রেসকোর্স রোড হয়নি। ২০০৪ সালের ২০শে মে সাতসকালে ডাকা সাংবাদিক সম্মেলনে ভাবী প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন (বলা চলে মানুষের রায়কে মনে রেখে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন), তা আজ ওঁর মনে নাও থাকতে পারে। কিন্তু টি ভি চ‌্যানেলের সরাসরি সম্প্রচারের দৌলতে দেশের মানুষের মনে হয়েছিল, হ‌্যাঁ, আমাদের রায়কে তাহলে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। মনমোহন সেদিন বলেছিলেন, ‘‘ আমাদের অগ্রাধিকার থাকবে গরিবি-র বিরুদ্ধে লড়াইয়ে। আমাদের কাজের কেন্দ্রবিন্দু হবে গরিব, গ্রামীণ ও কৃষিক্ষেত্র।’’ বলেছিলেন, ‘‘বেসরকারীকরণ আমার আদর্শগত দায়বদ্ধতা নয়…সংস্কার প্রয়োজন, কিন্তু তা এমনভাবে করতে হবে যাতে তার সুফল যাতে আম আদমি-র কাছে পৌঁছায়।’’ সেদিনের কথাগুলিই পরে আরো বিস্তারিতভাবে রূপ পেয়েছিল সাধারণ ন্যুনতম কর্মসূচী(সি এম পি)-তে, যা রূপায়ণের শর্তেই সমর্থন দিয়েছিলেন বামপন্থীরা।

সি এম পি-তে প্রতিশ্রুতি ছিল: ‘‘ ইউ পি এ সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলির দামবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে। ফট্‌কাবাজ, মজুতদার এবং কালোবাজারীদের ঠেকাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আইনকে কোনমতেই শিথিল করা হবে না।’’ গত চার বছরে এবিষয়ে সরকারের ভূমিকা কী ? মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ১৩ শতাংশ, গত ষোলো বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ জায়গায়জিনিসের দাম এই সময়ে বেড়েছে দ্বিগুণ, তিনগুণ হারে। ‌খাদ্যশস্যসহ কৃষিপণ্যে ফট্‌কাবাজির রমরমা চলছে। কৃষিপণ্যে ফট্‌কাবাজি রোধে খাদ্য, ক্রেতাবিষয়ক ও গণবন্টন মন্ত্রকের সংসদীয় স্ট‌্যান্ডিং কমিটির সুপারিশ ছিল ২৫টিতে আগাম বাণিজ্য নিষিদ্ধ করা। অথচ, বামপন্থীরা বার বার  দাবি জানানো সত্ত্বেও গত মে মাস পর্যন্ত মাত্র ৪টিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। রেশন ব্যবস্থা কার্যত উঠে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। মানুষের জীবন আরো অসহনীয় হয়েছে, মানুষ দেখেছেন সরকার নির্বিকার।

অগ্রাধিকার থাকার কথা ছিল গরিবি দুর করতে, বেকারী প্রশমিত করতে, কৃষকদের ভয়াবহ সমস‌্যা মোকাবিলায়। কিন্তু কি চিত্র এখন? খোদ কেন্দ্রীয় সরকারের সমীক্ষাই বলছে, দেশের ৭৭ শতাংশ মানুষ, যার সংখ‌্যা প্রায় ৮০ কোটি, তাদের দৈনিক আয় ২০ টাকারও কম। গোটাদেশে কর্মসংস্থান কমেছে, ভয়াবহ অসাম্য, বৈষম্য, এমনকি খাদ্য নিরাপত্তাতেও সঙ্কট দেখা দিয়েছে। দেশের অর্থনীতি দৌড়োচ্ছে ৯ শতাংশ বিকাশের হার নিয়ে, আর বাস্তবে গত ৪ বছরে সংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মসঙ্কোচন হয়েছে প্রায় ৫০ লক্ষ। কৃষিক্ষেত্রে উদারীকরণের নীতির ভয়াবহ বহির্প্রকাশ ঘটেছে কৃষকদের আত্মহত‌্যার মধ্যে দিয়ে। ন‌্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য বলছে, ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ে ১ লক্ষ ৬৬ হাজার ৩০৪ জন কৃষক আত্মহত‌্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। ২০০২ সাল থেকে  প্রতি ৩০ মিনিটে ১ জন করে কৃষক তার জীবনকে পৃথিবী মুছে দিতে বাধ্য হয়েছেন।

প্রতিশ্রতি ছিল: দেশের শ্রমজীবীদের ৯৩ শতাংশই যারা, সেই অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক ও ক্ষেতমজুরদের সম্পূর্ণ সামাজিক সুরক্ষার লক্ষ্যে দু’টি পৃথক আইন তৈরি করা। কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতা হলো, অসংগঠিত ক্ষেত্রের জন্য নাম কা ওয়াস্তে একটি বিল তৈরি করে তাকে হিমঘরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এমনকি শ্রম দপ্তরের স্ট‌্যান্ডিং কমিটি এবিষয়ে যে সুপারিশগুলি করেছে, তাকেও কোনোরকম তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। ক্ষেতমজুরদের জন্য আইন তো দুর অস্ত্‌।

রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতিই বা কোথায় গেলো ? বলা হয়েছিল: ‘‘সাধারণভাবে লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিকে বেসরকারীকরণ করা হবে না।’’ তাহলে এয়ারপোর্ট অথরিটি অব ইন্ডিয়া কি লোকসানে চলে? যে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বছরে নিট মুনাফা ৪৪৮ কোটি টাকা, আর যে লাভের ৮০ শতাংশই আসে দিল্লি, মুম্বাই আর চেন্নাই বিমানবন্দর থেকে, সেগুলো আধূনিকীকরণের নামে বিক্রি করতে বিদেশী বহুজাতিককে ডেকে আনা কেন ? বামপন্থীদের চাপে  শেষপর্যন্ত কলকাতাসহ চেন্নাই বিমানবন্দরের বেসরকারীকরণ আটকালেও রোখা যায়নি দিল্লি ও মুম্বাইকে। ৫২৬১ কোটি টাকার বিশাল মুনাফাকারী এন টি পি সি-র মতো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার শেয়ার কোন প্রয়োজনে বাজারে বিক্রি, তা বোধগম্য হয়নি মানুষের।   

চেষ্টা হয়েছে আরো। আটকেছেন বামপন্থীরা। ব‌্যাঙ্ক, বীমা, পেনশন তহবিল, ভবিষ্যনিধি   বেসরকারী হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা ছিল প্রথম দিন থেকেই।পারেনি, কারণ বামপন্থীরা ছিল সতর্ক। শ্রমিকদের ওপর কর্পোরেট প্রভুদের দৌরাত্ম্য বাড়াতে চেষ্টা ছিল শ্রম আইনগুলিকে শিথিল করার। পেছনের দরজা দিয়ে চেষ্টাও হয়েছে অবিরত। যতটা সম্ভব রুখেছেন বামপন্থীরা। কেন্দ্রের প্রছন্ন সায়ে ও সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারগুলির প্রত্যক্ষ মদতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে হরিয়ানা, তামিলনাড়ু, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থানে, এমনকি  সংগঠিত ক্ষেত্রেও শ্রমিকদের ওপর হিংস্র আক্রমণ নামিয়ে আনার ঘটনা ঘটছে

সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছে, দেশের দীর্ঘলালিত স্বাধীন বিদেশনীতিকে জলাঞ্জলি দেওয়ায়। বি জে পি-র পথেই কংগ্রেস নেতৃত্ব হেঁটেছে আমেরিকার তোষামোদে। পরমাণু চুক্তির নামে স্বাধীনতার পর থেকে চলা সহমতের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা স্বাধীন জোটনিরপেক্ষ বিদেশনীতি থেকে সরে গিয়ে  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক জোটসঙ্গী গড়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। অথচ, সাধারণ ন্যূনতম কর্মসূচীতে স্বাধীন বিদেশনীতি অনুসরণের সুস্পষ্ট ঘোষণা ছিল, ছিল বহুমেরু বিশ্বের ধারণাকে পুষ্ট করার কথা। তার বদলে যে দেশ ইরাকে, আফগানিস্তানে, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে গণতন্ত্রকে পদদলিত করছে, সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির প্রভাব যে ভয়ঙ্কর হবে, সেই সতর্কবার্তা বার বার জানিয়েছিলেন বামপন্থীরা। বামপন্থীরা বলেছেন, এই চুক্তির ফলে ১০০ কোটির বেশি মানুষের দেশ ভারত আমেরিকার যুদ্ধজোটে মিত্র হওয়ার ফলে গোটা পৃথিবীর ভারসাম্য টলে যাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে। এই ঘটনা আমরা কখনই মেনে নিতে পারি না।  এবং মানেননি তাঁরা, সরকার থেকে সমর্থন প্রত‌্যাহার করেছেন।

আগেই সি এম পি-তে দেওয়া প্রতিশ্রুতির ভূলে যাওয়ার চেষ্টা ছিল। আর ৮ই জুলাইয়ের  পর মনোভাব ‘গোল্লায় যাক সি এম পি’তাই আস্থাভোটে জুয়াচুরি করে জেতার পরদিনই, ২৩শে জুলাই অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরমের বন্ধনমুক্তির উল্লাস। বণিক সভা ফিকি-র বৈঠকে গিয়ে তিনি বলছেন, ব‌্যাঙ্ক-বীমা-পেনশন তহবিলকে বেসরকারীকরণের লক্ষ্যে আনা বকেয়া বিল তিনটি সংসদের পরের অধিবেশনেই পেশ করা হবে। একটি অংশের বাধায় এগুলো বকেয়া থেকে গেছে। এদিকে, মাত্র ৭দিনের মাথায় কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড ম‌্যানেজারের তালিকায় ঢোকানো হলো ভায়া অমর সিং ‘নতুন মিত্র’  অনিল আম্বানির রিলায়েন্স ক‌্যাপিটালকে। পাইপলাইনে আছে আরো অনেক কিছুই, যা সরকার গড়ার সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতির বিপরীতমুখী।

এর পরেও বলবেন বিশ্বাসঘাতকতা নয়? দেশের মানুষের সঙ্গে এই প্রতারণার মাশুল গুণতে হবে কংগ্রেসকে, যেমন গুণতে হয়েছিল ১৯৯৬ সালেও তার থেকে শিক্ষা নেয়নি, কারণ ওদের ভবি ভোলবার নয়। আসলে পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন-বেসরকারীকরণ-নয়া উদারীকরণের পথে হাঁটা কংগ্রেস যে মানুষের স্বার্থের নীতিতে অবিচল থাকতে পারে না, তা বামপন্থীরাও জানতেন, জানেন দেশের শ্রমজীবী সাধারণ মানুষও। তাই ওদের সরকারের ঘোষণা করা ‘জাতীয় সাধারণ ন্যুনতম কর্মসূচী’ ওরাই এখন আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলতে চাইছে। আর সেই  সাধারণ ন্যুনতম কর্মসূচী রূপায়ণের শর্তে প্রতিনিয়ত চাপ দেওয়ার পাশাপাশি বামপন্থীদের বিশ্রামহীন লড়াই চলেছে সংসদের ভেতরে ও বাইরে। লড়াই চলেছে উদারীকরণের নীতির বিরুদ্ধে, যার শুরু ১৯৯১ সাল থেকেই 

২০শে আগস্ট ছিল সেই লড়াইয়েরই একটা ধাপ, যার মধ্যে দিয়ে আরো বড় লড়াইয়ের শুরু১৯৯১ সালের ২৯ শে নভেম্বর বিশ্বায়ন-বেসরকারীকরণ-নয়া উদারীকরণের নীতির বিরুদ্ধে প্রথম দেশব‌্যাপী ঐক্যবদ্ধ সাধারণ ধর্মঘটের মধ্যে দিয়ে দেশের শ্রমজীবী মানুষ জানান দিয়েছিলেন যে, মানছি না সাম্রাজ্যবাদের প্রেসক্রিপশন অনুসারী তোমাদের এই নীতিকে। তারপর থেকে ২০০৬ সালের ১৪ই ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১১ বার দেশজুড়ে ঐক্যবদ্ধ সাধারণ ধর্মঘট হয়েছে। ২০শে আগস্ট ছিল ১২ তম। প্রতিবারই ধর্মঘটের পরিধি বেড়েছে, যোগ দিয়েছে নতুন নতুন মিত্র। এবারের পরিধি হয়েছে আরো বড়, ধর্মঘটের সাফল্যও ছিল ব‌্যাপকতরআর তা হবে বুঝেই পাতাজোড়া বিজ্ঞাপনের পুরনো খেলায় নেমেছিল কংগ্রেস।

কিন্তু ওদের বিসমিল্লায় গলদ একটাই। অভিজ্ঞতা থেকে শেখার অভ‌্যাস নেই যে কংগ্রেসের! গত লোকসভা নির্বাচনের আগে সরকারী কোষাগারে জমা হওয়া জনগণের ৪০০ কোটি টাকা খরচ করে ‘ঝক্‌মকে ভারত’-এর বিজ্ঞাপন  দিয়েও বি জে পি-র শেষরক্ষা হয়নি। তল্পি-তল্পা গোটাতে বাধ্য করেছিলেন দেশের মানুষ।

কংগ্রেসেরও কি প্রহর গোনা শুরু হয়নি ? ২০শে আগস্ট তা সজোরে তা জানান দিয়েছে

গণশক্তি, ২১শে আগস্ট, ২০০৮, উত্তর-সম্পাদকীয়