Archive for জুলাই, 2009

বামফ্রন্ট সরকারের ৩৩ বছরে জ্যোতি বসুর পরামর্শ

জুলাই 5, 2009

 

মানুষের ওপর ভরসা রাখুন,

শুধরে নিন নিজেদের ভুল

 

এরাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার স্থিতিশীল, শান্তির পরিবেশ এবং জনমুখী উন্নয়নের নজির তৈরি করে গোটা দেশের সামনে একটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম তুলে ধরেছে। রাজ্যের মানুষ এটা দেখেছেন, তাই তাঁরা প্রতিটি নির্বাচনে বামফ্রন্টকেই বেছে নিয়েছেন। এটা ঠিকই যে গত লোকসভা নির্বাচনে একটা ব্যতিক্রমী ফলাফল হয়েছে। কেন এমন হলো তার জন্য আমাদের গভীর আত্মসমীক্ষা করতে হবে। আমি শুধু একটা কথাই বলবো, মানুষের ওপরে আমরা যেন ভরসা না হারাই। কারণ মানুষই ইতিহাস রচনা করেন। সাময়িকভাবে হয়তো কেউ হয়তো ভুল বুঝতে পারেন, কিন্তু আমরা যদি সেই মানুষের কাছে বারবার যাই, তাঁদের ভালোবাসার যোগ্য হয়ে উঠি, তবে তাঁরা নিশ্চয়ই আমাদের বুঝবেন। গত পঞ্চায়েত ও লোকসভা নির্বাচনে আমাদের বিরুদ্ধে যারা চলে গেছেন, তাঁদেরকে আবার আমাদের দিকে টেনে আনতে হবে। শুধু তাঁদেরই নয়, আরো নতুন নতুন মানুষকেও টেনে আনতে হবে। পাশাপাশি নিজেদের যে ভুল আছে তাও শুধরে নিতে হবে। বামফ্রন্ট সরকারের ৩৩ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে গণশক্তিকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে একথা বললেন জননেতা জ্যোতি বসু। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ‌অজয় দাশগুপ্ত।

 

 

 

 

 

প্রশ্ন : আজ এরাজ্যে বামফ্রন্ট সরকারের ৩২বছর পূর্ণ হচ্ছে। এই উপলক্ষে রাজ্যবাসীর কাছে আপনার বার্তা কী?

জ্যোতি বসু : রাজ্যের  সমস্ত মানুষকে আমার শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। ১৯৭৭সালে এরাজ্যে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে টানা সাতবার বিধানসভা নির্বাচনে এরাজ্যের মানুষ বামফ্রন্টকেই জয়ী করে এসেছেন। এটা শুধু ভারতেই নয়, গোটা পৃথিবীর সংসদী‌য় গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটা ন‍‌জিরবিহীন ঘটনা। এই নজির গড়ার কৃতিত্ব এরাজ্যের সচেতন, সংগ্রামী মানুষেরই। আমি তাই এই উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে আমার অভিনন্দন, ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

প্রশ্ন: এরাজ্যের মানুষ যে এতদিন ধরে বামফ্রন্ট সরকারকে বেছে নিয়েছেন, তার পেছনে মূল কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?

জ্যোতি বসু: কারণ আমরা সবসময় মানুষের স্বার্থকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। আমরা যখন সরকারে এলাম, খুবই সীমিত আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা নিয়ে কাজ শুরু করতে হয়েছিলো। আজ এটা সবাই স্বীকার করবেন যে, এই সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার মানুষের স্বার্থে অনেক কাজ করতে পেরেছে। সরকারে আসার প্রথম দিনই আমরা ঘোষণা করেছিলাম, শুধু মহাকরণ থেকে এই বামফ্রন্ট সরকার চলবে না, সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমতা পৌঁছে দিতে হবে। পঞ্চায়েত এবং পৌরসভার মাধ্যমে গরিব সাধারণ মানুষের হাতে সেই ক্ষমতা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, বামফ্রন্ট সরকার গোটা দেশের সামনে মানুষের স্বার্থে বিকল্প কর্মসূচীর একটা নজিরও তুলে ধরতে পেরেছে।এরাজ্যে  বামফ্রন্ট সরকার স্থিতিশীল, শান্তির পরিবেশ এবং জনমুখী উন্নয়নের নজির তৈরি করে গোটা দেশের সামনে একটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম তুলে ধরেছে। রাজ্যের মানুষ এটা দেখেছেন, তাই তাঁরা প্রতিটি নির্বাচনে বামফ্রন্টকেই বেছে নিয়েছেন। আমরা যে এতদিন সরকারে রয়েছি, তা মানুষের ইতিবাচক রায়েই রয়েছি।

প্রশ্ন : কিন্তু গত লোকসভা নির্বাচনে আমরা দেখলাম ৩২ বছরে এই প্রথম একটি নির্বাচনে বিরোধীরা বামফ্রন্টের থেকে বেশি আসনে জয়ী হলো। তার আগে পঞ্চায়েত নির্বাচনেও বামফ্রন্টের ফল খারাপ হয়েছে। এই ঘটনাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

জ্যোতি বসু : হ্যাঁ , এটা ঠিকই যে গত লোকসভা নির্বাচনে একটা ব্যতিক্রমী ফলাফল হয়েছে। কেন এমন হলো তার জন্য আমাদের গভীর আত্মসমীক্ষা করতে হবে। আমাদের পার্টি, বামফ্রন্টের শরিক দলগুলি নির্বাচনী ফলাফলের বিস্তারিত পর্যালোচনা করছে। দিল্লিতে আমাদের পার্টির পলিট ব্যুরো ও কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক এখন চলছে। আলোচনা করে নিশ্চয়ই আমরা ভুল-ত্রুটিগুলি চিহ্নিত করতে পারবো।

প্রশ্ন : গত নির্বাচনে ফলাফল এরকম খারাপ হওয়ার পেছনে কি কি কারণ আছে বলে আপনার মনে হচ্ছে।

জ্যোতি বসু : আমাদের পার্টি বলেছে, এর পিছনে যেমন জাতীয় কারণ আছে, তেমনি রাজ্যের বা স্থানীয় কারণও রয়েছে। নির্বাচনে আমাদের যা বক্তব্য ছিল, কি আমরা করতে চাই, তা মানুষকে আমরা সঠিকভাবে বোঝাতে পারিনি। আমরা যেটা করতে চেয়েছিলাম, সেই তৃতীয় ফ্রন্টও কি হবে ‌অথবা কিভাবে হবে, তা মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়নি। আমরা যে বি জে পি-র মতো সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ঠেকাতে কংগ্রেসের নেতৃত্বে একটা জোট সরকারকে সাধারণ ন্যূনতম কর্মসূচী (সি এম পি)-র ভিত্তিতে সমর্থন করেছিলাম, মানুষ বুঝেছিলেন এটা খুবই জরুরী ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে  কংগ্রেস কথা রাখলো না, ওরা সি এম পি মানলো না। ওঁরা আমেরিকার তাঁবেদারি করার পথে এগোলো। তাই এই সমর্থন আমাদের তুলে দিতে নিতে হলো। কিন্তু মানুষকে এবিষয়ে আমাদের বক্তব্য আমরা বোঝাতে পারিনি। 

প্রশ্ন : আর এরাজ্যের ক্ষেত্রে কোন কারণগুলি নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে হয়।

জ্যোতি বসু : আমার মনে হয়, শিল্পের জন্য জমি নেওয়া হবে একথা বলায় মানুষ ভয় পেয়েছেন। আমাদের বিরুদ্ধে প্রচার করা হয়েছে, বামফ্রন্ট সরকার নাকি কৃষকের জমি কেড়ে নেবে। এসব অসত্য প্রচার মানুষের মধ্যে প্রভাব ফেলেছে। এরাজ্যে গ্রামের লক্ষ লক্ষ ভূমিহীন গরিব মানুষকে তো আমরাই ভূমিসংস্কার, অপারেশন বর্গা করে জমি দিয়েছি। কৃষির আরো উন্নতি করেই যে আমরা শিল্প করতে চাই, মানুষের উপলব্ধির মধ্যে তা আনতে পারিনি। কৃষিতে তো আমরা অনেক এগিয়েছি, খাদ্যে স্বনির্ভর হয়েছি। সারা দেশে কৃষি উৎপাদনে অনেকদিন ধরে আমরাই শীর্ষে। কিন্তু কৃষিক্ষেত্রে আরো উন্নতির সুযোগ রয়েছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহায্য নিয়ে আমাদের কৃষির মান আরো উন্নত করতে হবে, কৃষির এলাকা আরো ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে, সেকাজ আমরা করছিও। কিন্তু সেকথা মানুষের কাছে তুলে ধরা যায়নি।

প্রশ্ন : নির্বাচনে এরকম ফলাফলের প্রেক্ষিতে বামফ্রন্ট কর্মীদের এখন কী করণীয় বলে আপনি মনে করছেন?

জ্যোতি বসু : আমি শুধু একটা কথাই বলবো, মানুষের ওপরে আমরা যেন বিশ্বাস না হারাই। কারণ মানুষই ইতিহাস রচনা করেন। সাময়িকভাবে কেউ হয়তো ভুল বুঝতে পারেন, কিন্তু আমরা যদি সেই মানুষের কাছে বারবার যাই, তাঁদের ভালোবাসার যোগ্য হয়ে উঠি, তবে তাঁরা নিশ্চয়ই আমাদের বুঝবেন। গত পঞ্চায়েত ও লোকসভা নির্বাচনে আমাদের বিরুদ্ধে যারা চলে গেছেন, তাঁদেরকে আবার আমাদের দিকে টেনে আনতে হবে। শুধু তাঁদেরই নয়, আরো নতুন নতুন মানুষকেও টেনে আনতে হবে। পাশাপাশি নিজেদের যে ভুল আছে তাও শুধরে নিতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের চেতনা আছে, তাঁরা  অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে উপলব্ধি করেছেন কে শত্রু, কে মিত্র। আমার বিশ্বাস আছে, এরাজ্যের মানুষ কারা তাঁদের ভালো চায়, এরাজ্যকে অগ্রগতির পথে কারা নিয়ে যেতে চায়, কারা রাজ্যকে পিছিয়ে দিতে চাইছে, এটাও তাঁরা নিশ্চয়ই সঠিকভাবে উপলব্ধি করবেন। মানুষের জয় হবেই।

প্রশ্ন : আপনার নিজের কথা কিছু বলুন।

জ্যোতি বসু : আমার কথা কি আর বলবো, আর কদিন বাদেই আমার ৯৫ বছর বয়স হবে। ৭০বছরের বেশি সময় ধরে রাজনীতি করছি। কিন্তু আমি এখন অপারগ। এবারে তো অসুস্থতার জন্য ভোটও দিতে পারলাম না। তবে নির্বাচনের পর কাগজে একটা জিনিস দেখে আমার খুবই ভালো লাগলো। এখন যেসব ঘটছে, তা নিয়ে বামফ্রন্টের সভায় ঐক্যবদ্ধভাবে প্রস্তাব নেওয়া হয়েছে, বাইরেও সবাই একই সুরে কথা বলেছেন। কেউ কারো বিরুদ্ধে বলেননি। এটা একটা বড়ো বিষয়। অনেক আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে এরাজ্যে বামফ্রন্ট তৈরি হয়েছে। তাই বামফ্রন্টের ঐক্যকে আমাদের ‌অটুট রাখতেই হবে। এরাজ্যে জনগণের যে দূর্গ তৈরি হয়েছে, সেই ঐতিহ্যকে আমাদের অম্লান রাখতে হবে। এটাই আমার কথা। আমি আপনাদের সবাইকে আরেকবার অভিনন্দন জানাচ্ছি।

 

 

 

 

 

 

Advertisements