দেশের অর্থনীতি কি এবার চলবে ওয়াশিংটন থেকে ?

 

 

 

 

দেশের অর্থনীতি কি এবার চলবে ওয়াশিংটন থেকে ?

অজয় দাশগুপ্ত : পরমাণু চুক্তি থেকে ব‌্যাঙ্ক-বীমা-পেনশন ফান্ড বেসরকারী হাতে তুলে দেওয়াতে বাধা যে একমাত্র বামপন্থীরাই, সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলেন ওয়াল স্ট্রিটের কর্তা থেকে শুরু করে মুম্বাই স্টক এক্সচেঞ্জের মাতব্বররা।

তাই আসলে লড়াইটা শুরু হয়েছিল প্রথম দিন থেকেই। সাধারণ ন্যূনতম কর্মসূচী রূপায়ণের শর্তে বামপন্থীদের সমর্থনে ভারতের সরকার গঠিত হওয়ার সংবাদেই আর্তনাদ উঠেছিল ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে। সরাসরি এমন প্রশ্নও ওরা  তুলেছিল, যে সাধারণ নির্বাচনে ভারতের ‘অর্থনৈতিক সংস্কার’ প্রক্রিয়াই থেমে যাবে, সেই দেশে গণতন্ত্রের মূল্য কী ? ভাবুন একবার, কি সাংঘাতিক ঔদ্ধত্য ! আর সেই প্রেক্ষাপটেই বিদেশী অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলির অঙ্গুলিহেলনে মুম্বাই শেয়ার বাজারের তর্‌ তর্‌ করে নেমে যাওয়া, আতঙ্কিত সোনিয়া গান্ধীর ‘প্রত‌্যাখান’-এর ভাবমূর্তি নির্মাণ যার অবশ্যম্ভাবী ফলশ্রুতিতে  তথাকথিত ‘অর্থনৈতিক সংস্কার’-র গুরু মনমোহন সিং ও ওয়াল স্ট্রিট কর্তাদের ‘চোখের মণি’ মন্টেক-চিদাম্বরম বাহিনীর মসনদে আরোহণের পথ মসৃণ হওয়া।

গত চার বছর তাই লড়াই চলেছে প্রতিদিন, প্রতিমূহুর্তে। ওরা বলেছে, ডি ভি সি, এন টি পি সি-র শেয়ার বাজারে বেচবো। বামপন্থীরা বলেছেন, না, ওগুলো দেশের ‘নবরত্ন’ শিল্প, ওগুলোই যদি দেশী-বিদেশী হাঙরদের বেচে দাও, তবে  আমাদের রইলোটা কী? চিদাম্বরম বললেন, তাহলে টেলিকম আর বিমানবন্দরে ওরা আরো বেশিভাবে ঢুকুক। বামপন্থীরা বললো, সর্বনাশ! তা কি করে হয় ? এগুলো তো দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। ওরা বললো, এত টাকা পেনশন তহবিলে রেখে কি হবে ? এগুলো খাটুক শেয়ার বাজারে। বামপন্থীদের সাবধানবাণী, শ্রমিক-কর্মচারীদের কষ্টার্জিত টাকা এভাবে শেয়ার বাজারে ছিনি-মিনি খেলার জন্য নয়। ওয়াল স্ট্রিটের মুরুব্বিরা চেয়েছে, তাই চিদাম্বরমরা বলেছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক-বীমাশিল্প, গোটা আর্থিক ক্ষেত্রকেই খুলে দেওয়া হোক খোলাবাজারে। সরাসরি আসুক বিদেশী প্রতিষ্ঠানিক সংস্থাগুলো। সংসদ তোলপাড় করে বামপন্থীরা বলেছেন, তাহলে কি দেশের অর্থনীতি এবার চলবে ওয়াশিংটন থেকে ?  সংসদের বাইরে ব‌্যাঙ্ক-বীমাশিল্পের কর্মচারী-অফিসাররা একবাক্যে বলেছেন, মানবো না। যেদিনই সংসদে পেশ হবে এই বিল, সেদিন গোটাদেশে খুলবে না দেশের একটি ব‌্যাঙ্কের দরজাও।

সংঘাত লেগেছে প্রতিনিয়ত। সংঘাত অভিমুখ নিয়ে। বামপন্থীরা বলেছেন, তুমি দেশের সরকার, তুমি কার স্বার্থে চলবে ? দেশের দু’বেলা দু’মুঠো খেতে না পাওয়া ৭০ ভাগ মানুষের স্বার্থে, না স্ত্রীর জন্মদিনে ২৫০ কোটি টাকার জেট বিমান উপহার দেওয়া সেই শিল্পপতির স্বার্থে, যে শিল্পপতির পড়ে পাওয়া ষোলো আনা মুনাফার পাহাড় যাতে আকাশ ছোঁয়, তারজন্য তুমি দু’দিন অন্তর তেলের দাম বাড়িয়েই চলেছো। আর জিনিসের দাম নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য রেশন দোকানগুলোকে চাঙ্গা করতেই তোমার যতো আপত্তি!  খুচরো ব্যবসার জন্য দেশের ৪ কোটি খেটে খাওয়া মানুষের কি হবে, সেকথা একবারও না ভেবে খোদ প্রধানমন্ত্রী  বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের দোরে দোরে দরবার করছেন আমেরিকার দানব বহুজাতিক ‘ওয়াল মার্ট’-এর জন্য! লক্ষ লক্ষ কর্মচারীর তোয়াক্কা না করে মন্টেক সিং আলুওয়ালিয়ার দাওয়াই, সরকারী দপ্তরের ঢালাও আউটসোর্সিং, কর্মসঙ্কোচন, কাজের সুযোগ আরো কমিয়ে দাও। এরকম একটার পর একটা।

বামপন্থীরা মানেনি, যতটা সম্ভব রুখেছে, শেষ পর্যন্ত রোখার চেষ্টা করেছে সংসদের ভেতরে এবং সংসদের বাইরে। বিষয়টা যখন দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীন বিদেশনীতির, তখন বামপন্থীদের কাছে আপসের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এবং আমেরিকার যুদ্ধজোটে ভারতের লেজুড় হওয়াকে স্বাভাবিকভাবেই বামপন্থীরা মেনে নেননি। ইউ পি এ সরকার থেকে সমর্থন প্রত‌্যাহার করেছে বামেরা।

আজ তাই ওরা উল্লসিত! না,কড়া অভিভাবকের হাত থেকে স্কুল পালানো ছেলের মুক্তি এটা নয়, জনতার স্বার্থে লড়াকু প্রতিনিধির ‘কারাগার’ থেকে জনবিরোধী ‘দাগী আসামী’র  মুক্তি!  গত ২৩শে জুলাইতেই চিদাম্বরমের উল্লাস তাই সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে। বণিক সভার বৈঠকে গিয়ে উদাত্ত আশ্বাস, ব‌্যাঙ্ক-বীমা-পেনশন বিল এবার রুখবে কে? সংসদের পরের অধিবেশনেই  ৪০০ জনের বেশি সাংসদের সমর্থন আদায় নাকি তাঁর হাতের মুঠোয়। সাগরপাড়ের কর্তাদের উচ্ছাসও চাপা থাকছে না, খোলাখুলি সংস্কারের ‘স্টিমরোলার’ চালানোর সওয়াল তাদের।

কিন্তু গোড়ায় একটা ওরা গলদ করছেন । আসমুদ্রহিমাচল জনতার অভিমতকে থোড়াই কেয়ার করলে যে তার মাশুল গুণতে হবে, সেটা ওদের ধর্তব্যের মধ্যেই নেই, গত লোকসভা নির্বাচনে বি জে পি-কে যা কড়ায়-গন্ডায় গুণতে হয়েছিল।

মানুষ তাই ফুঁসছেন। বামপন্থীদের নেতৃত্বে গত চার বছর লড়াই তারা করেছেন। লড়াইকে আরো তেজীয়ান, তুঙ্গীয়ান করার সঙ্কল্প নিয়েছেন শ্রমিক-কৃষক-কর্মচারী-ছাত্র-যুব-মহিলা-ক্ষেতমজুর-সংগঠিত ও অসংগঠিত সমস্ত ক্ষেত্রের সংগঠন-গণসংগঠনগুলি। আগামী ২০শে আগস্ট দেশজুড়ে সাধারণ ধর্মঘট সেই লড়াইয়েরই একটা ধাপ। 

 

গণশক্তি, ১১ই আগস্ট, ২০০৮, প্রথম কলম

Advertisements

ট্যাগ সমুহঃ ,

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s


%d bloggers like this: