মাহমুদ দারবিশ ( ১৩ই মার্চ, ১৯৪১- ৯ই আগস্ট, ২০০৮)

আপস ছিল তাঁর নাপসন্দ

অজয় দাশগুপ্ত

 

হিউস্টনের হাসপাতালে ওপেন হার্ট সার্জারি করার আগে একটি বন্ডে তিনি লিখে দিয়েছিলেন, ‘যদি আমার মস্তিষ্কের মৃত্যু ঘটে, তৎক্ষণাৎ যেন অক্সিজেনের নলটাও খুলে দেওয়া হয়।’ ঠিক এই একটি ঘটনা দিয়েই ব্যক্তি দারবিশকে, তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে চেনা যায়। জীবন্মৃত হয়ে তিনি কোনোদিনও বেঁচে থাকতে চাননি।

মাহমুদ দারবিশ আরব দুনিয়ায় প‌্যালেস্তাইনের জাতীয় কবিহিসেবেই বিবেচিত হতেন। ৩০টির বেশি কবিতার বই, আর ৮টি গদ্য গ্রন্থের প্রণেতা এই কবি মাতৃভূমি প‌্যালেস্তাইনের প্রতি তাঁর গভীর আবেগের জন্য সুপরিচিত ছিলেন কিন্তু শুধু ‘কবি’, এই পরিচয়েই দারবিশকে সীমাবদ্ধ রাখা অন‌্যায় হবে। কারণ প‌্যালেস্তাইনের মানুষের অবরুদ্ধ ভাষাকে তিনি মূর্ত করেছেন কবিতায়, আকার দিয়েছেন তাঁদের আত্মোপলব্ধিকে।

তাই হাজারো মানুষের ভিড়ে তাঁর কবিতার নির্ঘোষ, কবিতার পংক্তি ডানা মেলেছে সুরের, হয়ে উঠেছে গান। দারবিশের কবিতার লাইন জেগে উঠেছে গাজা ভূখন্ডের বাসিন্দা আরব রমণীর সূচীকর্মে, তরুণ প‌্যালেস্তিনীয়ের টি-শার্টে লোগো হয়ে জোরালো করেছে জায়নবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষাকে।   

১৯৪১ সালের ১৩ মার্চ বর্তমান উত্তর ইজরায়েলের গ‌্যালিলি অঞ্চলে হাইফার কাছে আল-বিরওয়া নামে একটি আরব গ্রামে দারবিশের জন্ম। ১৯৪৮ সালের আরব-ইজরায়েল যুদ্ধে তাঁদের পুরো গ্রামই ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। শৈশবেই বাস্তুহারা হন তিনি। পরে আবার ফিরে এলেও ১৯৭০ সালে  অধিকৃত প‌্যালেস্তাইনে তাঁর ঢোকায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। দীর্ঘ ২৬ বছরের কিছু সময়  মস্কোতে বাদ দিলে কখনো কায়রো, কখনো বেইরুট, কখনো বা টিউনিস, বিভিন্ন আরব দেশের রাজধানী শহরেই ছিল তাঁর নির্বাসনের জীবন এমনকি তাঁর মা যখন মৃত্যুশয‌্যায়, তখনও শেষকৃত্যের জন্য কিছু সময় বাদ দিলে গ‌্যালিলিতে গিয়ে দেখার অনুমতি তাঁকে দেওয়া হয়নি। জীবনের উপান্তে এসে তিনি অনুমতি পান প‌্যালেস্তাইনে বাস করার। ১৯৯৬ সালে জর্ডন নদীর পশ্চিম তীরে(ওয়েস্ট ব‌্যাঙ্ক) রামাল্লা শহরে গিয়ে বসবাস শুরু করেন দারবিশ।

১৯৬০ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ পাখ্‌হীন পাখি‘ (উইংলেস্‌ বার্ড) প্রকাশের মধ্য দিয়ে আরব সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করেন তিনি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব এবং নিবার্সিত জীবনের যন্ত্রণা তাঁর ক্ষুরধার লেখনীতে ভাষা পেয়েছে সবসময়। ১৯৮২ সালে বেইরুটে থাকার সময় লেবাননে ইজরায়েলী আক্রমণ এবং বোমাবর্ষণের সময় তিনি লিখছেনঃ

‘‘ এই সেই রাস্তা,

আর এখন ঘড়িতে সন্ধ‌্যা ৭টা।

দিগন্ত যেন ইস্পাত বলয়।

আমার নিষ্পাপ আবেগের কথা

আমি এখন কাকে বলবো ?…

এই রাস্তায় এমন আস্তে হাঁটছি

যেন একটা জেট বিমানও

আমাকে বোমার লক্ষ্য হিসাবে ভুল না করে।

শুন্যতা তার করাল বিস্তৃত করেছে,

কিন্তু তাও আমাকে গ্রাস করলো না।

লক্ষ্যহীনভাবে এগিয়ে চলেছি,

যেন এই রাস্তাগুলোকে আমি

প্রথমবার চেনার চেষ্টা করছি

এবং শেষবারের মতো হেঁটে চলেছি।

——‘‘মেমোরি ফর ফরগেটফুলনেস’’ 

 

গভীর পর্যবেক্ষণশক্তির অধিকারী এই কবি পরিণত হয়েছিলেন পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমে প‌্যালেস্তাইনের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রতীকে আরবি ভাষায় লেখালেখি করলেও ইংরেজি , হিব্রু ও ফরাসি ভাষায় বাক্যালাপের দক্ষতা দারবিশের ছিল। তাঁর লেখনী এবং রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় উপস্থিতির মধ্য দিয়ে প‌্যালেস্তাইনের  স্বাধীনতা আন্দোলনের বিষয়ে উচ্চকন্ঠ তিনি ইজরায়েলী দখলদারির তীব্র বিরোধিতার পাশাপাশি তিনি সবসময়ই প‌্যালেস্তাইনের রাজনীতিতে ঐক্যের প্রশ্নে সোচ্চার ছিলেন। স্বাধীন প‌্যালেস্তাইনের লক্ষ্যে  সংগ্রামরত হামাস এবং ফাতাহ্‌ গোষ্ঠীর মধ্যে অন্তর্কলহের তীব্রবিরোধী ছিলেন তিনি। একসময়ে ইজরায়েলের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য দারবিশ প‌্যালেস্তাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন বা পি এল ও-র কার্যকরী কমিটিতেও ছিলেন। স্বাধীন প‌্যালেস্তাইনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে ১৯৮৮ সালে প‌্যালেস্তাইনের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি ছিল মাহমুদ দারবিশেরই লেখা। সেইসময় প‌্যালেস্তাইনের স্বাধীনতা আন্দোলনের অবিসংবাদী নেতা ইয়াসের আরাফত বিশাল এক রাজনৈতিক সমাবেশে  ওই স্বাধীনতার একতরফা ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেছিলেন। কিন্তু ১৯৯৩ সালে ইয়াসের আরাফত ইজরায়েলের সঙ্গে অস্‌লোতে অর্ন্তবর্তীকালীন শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করায় পি এল ও থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। কারণ তিনি মনে করতেন এরফলে আপস করা হচ্ছে।

মৃত্যুর আগে দারবিশ রামাল্লাতেই সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা জানিয়ে গেছেন। কারণ স্বাধীনতার অদম্য আকাঙ্ক্ষা থেকেই তিনি চাননি অধিকৃত প‌্যালেস্তাইনে তাঁর শেষকৃত্য হোক। 
 
 

 

গণশক্তি, ১৬ই আগস্ট,২০০৮। ajoy_dasgupta@hotmail.com

 
 
 

 

Advertisements

ট্যাগ সমুহঃ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s


%d bloggers like this: