বামফ্রন্ট সরকারের ৩৩ বছরে জ্যোতি বসুর পরামর্শ

জুলাই 5, 2009

 

মানুষের ওপর ভরসা রাখুন,

শুধরে নিন নিজেদের ভুল

 

এরাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার স্থিতিশীল, শান্তির পরিবেশ এবং জনমুখী উন্নয়নের নজির তৈরি করে গোটা দেশের সামনে একটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম তুলে ধরেছে। রাজ্যের মানুষ এটা দেখেছেন, তাই তাঁরা প্রতিটি নির্বাচনে বামফ্রন্টকেই বেছে নিয়েছেন। এটা ঠিকই যে গত লোকসভা নির্বাচনে একটা ব্যতিক্রমী ফলাফল হয়েছে। কেন এমন হলো তার জন্য আমাদের গভীর আত্মসমীক্ষা করতে হবে। আমি শুধু একটা কথাই বলবো, মানুষের ওপরে আমরা যেন ভরসা না হারাই। কারণ মানুষই ইতিহাস রচনা করেন। সাময়িকভাবে হয়তো কেউ হয়তো ভুল বুঝতে পারেন, কিন্তু আমরা যদি সেই মানুষের কাছে বারবার যাই, তাঁদের ভালোবাসার যোগ্য হয়ে উঠি, তবে তাঁরা নিশ্চয়ই আমাদের বুঝবেন। গত পঞ্চায়েত ও লোকসভা নির্বাচনে আমাদের বিরুদ্ধে যারা চলে গেছেন, তাঁদেরকে আবার আমাদের দিকে টেনে আনতে হবে। শুধু তাঁদেরই নয়, আরো নতুন নতুন মানুষকেও টেনে আনতে হবে। পাশাপাশি নিজেদের যে ভুল আছে তাও শুধরে নিতে হবে। বামফ্রন্ট সরকারের ৩৩ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে গণশক্তিকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে একথা বললেন জননেতা জ্যোতি বসু। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ‌অজয় দাশগুপ্ত।

 

 

 

 

 

প্রশ্ন : আজ এরাজ্যে বামফ্রন্ট সরকারের ৩২বছর পূর্ণ হচ্ছে। এই উপলক্ষে রাজ্যবাসীর কাছে আপনার বার্তা কী?

জ্যোতি বসু : রাজ্যের  সমস্ত মানুষকে আমার শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। ১৯৭৭সালে এরাজ্যে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে টানা সাতবার বিধানসভা নির্বাচনে এরাজ্যের মানুষ বামফ্রন্টকেই জয়ী করে এসেছেন। এটা শুধু ভারতেই নয়, গোটা পৃথিবীর সংসদী‌য় গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটা ন‍‌জিরবিহীন ঘটনা। এই নজির গড়ার কৃতিত্ব এরাজ্যের সচেতন, সংগ্রামী মানুষেরই। আমি তাই এই উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে আমার অভিনন্দন, ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

প্রশ্ন: এরাজ্যের মানুষ যে এতদিন ধরে বামফ্রন্ট সরকারকে বেছে নিয়েছেন, তার পেছনে মূল কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?

জ্যোতি বসু: কারণ আমরা সবসময় মানুষের স্বার্থকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। আমরা যখন সরকারে এলাম, খুবই সীমিত আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা নিয়ে কাজ শুরু করতে হয়েছিলো। আজ এটা সবাই স্বীকার করবেন যে, এই সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার মানুষের স্বার্থে অনেক কাজ করতে পেরেছে। সরকারে আসার প্রথম দিনই আমরা ঘোষণা করেছিলাম, শুধু মহাকরণ থেকে এই বামফ্রন্ট সরকার চলবে না, সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমতা পৌঁছে দিতে হবে। পঞ্চায়েত এবং পৌরসভার মাধ্যমে গরিব সাধারণ মানুষের হাতে সেই ক্ষমতা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, বামফ্রন্ট সরকার গোটা দেশের সামনে মানুষের স্বার্থে বিকল্প কর্মসূচীর একটা নজিরও তুলে ধরতে পেরেছে।এরাজ্যে  বামফ্রন্ট সরকার স্থিতিশীল, শান্তির পরিবেশ এবং জনমুখী উন্নয়নের নজির তৈরি করে গোটা দেশের সামনে একটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম তুলে ধরেছে। রাজ্যের মানুষ এটা দেখেছেন, তাই তাঁরা প্রতিটি নির্বাচনে বামফ্রন্টকেই বেছে নিয়েছেন। আমরা যে এতদিন সরকারে রয়েছি, তা মানুষের ইতিবাচক রায়েই রয়েছি।

প্রশ্ন : কিন্তু গত লোকসভা নির্বাচনে আমরা দেখলাম ৩২ বছরে এই প্রথম একটি নির্বাচনে বিরোধীরা বামফ্রন্টের থেকে বেশি আসনে জয়ী হলো। তার আগে পঞ্চায়েত নির্বাচনেও বামফ্রন্টের ফল খারাপ হয়েছে। এই ঘটনাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

জ্যোতি বসু : হ্যাঁ , এটা ঠিকই যে গত লোকসভা নির্বাচনে একটা ব্যতিক্রমী ফলাফল হয়েছে। কেন এমন হলো তার জন্য আমাদের গভীর আত্মসমীক্ষা করতে হবে। আমাদের পার্টি, বামফ্রন্টের শরিক দলগুলি নির্বাচনী ফলাফলের বিস্তারিত পর্যালোচনা করছে। দিল্লিতে আমাদের পার্টির পলিট ব্যুরো ও কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক এখন চলছে। আলোচনা করে নিশ্চয়ই আমরা ভুল-ত্রুটিগুলি চিহ্নিত করতে পারবো।

প্রশ্ন : গত নির্বাচনে ফলাফল এরকম খারাপ হওয়ার পেছনে কি কি কারণ আছে বলে আপনার মনে হচ্ছে।

জ্যোতি বসু : আমাদের পার্টি বলেছে, এর পিছনে যেমন জাতীয় কারণ আছে, তেমনি রাজ্যের বা স্থানীয় কারণও রয়েছে। নির্বাচনে আমাদের যা বক্তব্য ছিল, কি আমরা করতে চাই, তা মানুষকে আমরা সঠিকভাবে বোঝাতে পারিনি। আমরা যেটা করতে চেয়েছিলাম, সেই তৃতীয় ফ্রন্টও কি হবে ‌অথবা কিভাবে হবে, তা মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়নি। আমরা যে বি জে পি-র মতো সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ঠেকাতে কংগ্রেসের নেতৃত্বে একটা জোট সরকারকে সাধারণ ন্যূনতম কর্মসূচী (সি এম পি)-র ভিত্তিতে সমর্থন করেছিলাম, মানুষ বুঝেছিলেন এটা খুবই জরুরী ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে  কংগ্রেস কথা রাখলো না, ওরা সি এম পি মানলো না। ওঁরা আমেরিকার তাঁবেদারি করার পথে এগোলো। তাই এই সমর্থন আমাদের তুলে দিতে নিতে হলো। কিন্তু মানুষকে এবিষয়ে আমাদের বক্তব্য আমরা বোঝাতে পারিনি। 

প্রশ্ন : আর এরাজ্যের ক্ষেত্রে কোন কারণগুলি নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে হয়।

জ্যোতি বসু : আমার মনে হয়, শিল্পের জন্য জমি নেওয়া হবে একথা বলায় মানুষ ভয় পেয়েছেন। আমাদের বিরুদ্ধে প্রচার করা হয়েছে, বামফ্রন্ট সরকার নাকি কৃষকের জমি কেড়ে নেবে। এসব অসত্য প্রচার মানুষের মধ্যে প্রভাব ফেলেছে। এরাজ্যে গ্রামের লক্ষ লক্ষ ভূমিহীন গরিব মানুষকে তো আমরাই ভূমিসংস্কার, অপারেশন বর্গা করে জমি দিয়েছি। কৃষির আরো উন্নতি করেই যে আমরা শিল্প করতে চাই, মানুষের উপলব্ধির মধ্যে তা আনতে পারিনি। কৃষিতে তো আমরা অনেক এগিয়েছি, খাদ্যে স্বনির্ভর হয়েছি। সারা দেশে কৃষি উৎপাদনে অনেকদিন ধরে আমরাই শীর্ষে। কিন্তু কৃষিক্ষেত্রে আরো উন্নতির সুযোগ রয়েছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহায্য নিয়ে আমাদের কৃষির মান আরো উন্নত করতে হবে, কৃষির এলাকা আরো ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে, সেকাজ আমরা করছিও। কিন্তু সেকথা মানুষের কাছে তুলে ধরা যায়নি।

প্রশ্ন : নির্বাচনে এরকম ফলাফলের প্রেক্ষিতে বামফ্রন্ট কর্মীদের এখন কী করণীয় বলে আপনি মনে করছেন?

জ্যোতি বসু : আমি শুধু একটা কথাই বলবো, মানুষের ওপরে আমরা যেন বিশ্বাস না হারাই। কারণ মানুষই ইতিহাস রচনা করেন। সাময়িকভাবে কেউ হয়তো ভুল বুঝতে পারেন, কিন্তু আমরা যদি সেই মানুষের কাছে বারবার যাই, তাঁদের ভালোবাসার যোগ্য হয়ে উঠি, তবে তাঁরা নিশ্চয়ই আমাদের বুঝবেন। গত পঞ্চায়েত ও লোকসভা নির্বাচনে আমাদের বিরুদ্ধে যারা চলে গেছেন, তাঁদেরকে আবার আমাদের দিকে টেনে আনতে হবে। শুধু তাঁদেরই নয়, আরো নতুন নতুন মানুষকেও টেনে আনতে হবে। পাশাপাশি নিজেদের যে ভুল আছে তাও শুধরে নিতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের চেতনা আছে, তাঁরা  অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে উপলব্ধি করেছেন কে শত্রু, কে মিত্র। আমার বিশ্বাস আছে, এরাজ্যের মানুষ কারা তাঁদের ভালো চায়, এরাজ্যকে অগ্রগতির পথে কারা নিয়ে যেতে চায়, কারা রাজ্যকে পিছিয়ে দিতে চাইছে, এটাও তাঁরা নিশ্চয়ই সঠিকভাবে উপলব্ধি করবেন। মানুষের জয় হবেই।

প্রশ্ন : আপনার নিজের কথা কিছু বলুন।

জ্যোতি বসু : আমার কথা কি আর বলবো, আর কদিন বাদেই আমার ৯৫ বছর বয়স হবে। ৭০বছরের বেশি সময় ধরে রাজনীতি করছি। কিন্তু আমি এখন অপারগ। এবারে তো অসুস্থতার জন্য ভোটও দিতে পারলাম না। তবে নির্বাচনের পর কাগজে একটা জিনিস দেখে আমার খুবই ভালো লাগলো। এখন যেসব ঘটছে, তা নিয়ে বামফ্রন্টের সভায় ঐক্যবদ্ধভাবে প্রস্তাব নেওয়া হয়েছে, বাইরেও সবাই একই সুরে কথা বলেছেন। কেউ কারো বিরুদ্ধে বলেননি। এটা একটা বড়ো বিষয়। অনেক আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে এরাজ্যে বামফ্রন্ট তৈরি হয়েছে। তাই বামফ্রন্টের ঐক্যকে আমাদের ‌অটুট রাখতেই হবে। এরাজ্যে জনগণের যে দূর্গ তৈরি হয়েছে, সেই ঐতিহ্যকে আমাদের অম্লান রাখতে হবে। এটাই আমার কথা। আমি আপনাদের সবাইকে আরেকবার অভিনন্দন জানাচ্ছি।

 

 

 

 

 

 

বামফ্রন্ট সরকারের ৩২ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সাক্ষাৎকার

মে 2, 2009

অন‌্যান্য বিষয়ের সঙ্গে শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ নিয়ে অমূলক আশঙ্কারও ছাপ পড়েছে গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে। সেইজন্য জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনের প্রশ্নে সরকারের নীতি আরও স্পষ্ট করা দরকার মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য একথা বলেছেন। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের ৩২ বছরে পদার্পণের প্রাক্‌কালে গণশক্তিকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এবিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন অজয় দাশগুপ্তসাক্ষাৎকারে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, তবে এটাও ঠিক, কয়েকটি ক্ষেত্রে যেমন এই কাজে বাধা এসেছে, তেমনি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষের সমর্থন ও সহমতের ভিত্তিতেই জমি নেওয়া হয়েছে। তাই বাধাটাই মূল নয়, সেটা ব্যাতিক্রম। তা সত্ত্বেও আমরা এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছি।

 

গণশক্তিঃ গত ৩১ বছর ধরে সংখ‌্যাগরিষ্ঠ মানুষের রায়ে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার জনস্বার্থে কাজ করে চলেছে। এই সরকারের সাফল্যগুলির মধ্যে কোন  দিকটিকে আপনি  বিশেষভাবে চিহ্নিত করতে চান ?

ভট্টাচার্যঃ বামফ্রন্ট সরকারের সাফল্যের কেন্দ্রে রয়েছে ভূমি সংস্কার, যারফলে এরাজ্যে গ্রামের গরিব মানুষের হাতে জমি এসেছে। শুধু প্রশাসনিকভাবে নয়, অনেক সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই এই সাফল্য এসেছে। প্রশাসন পরবর্তীতে তাঁদের হাতে পাট্টা তুলে দিয়েছে। ভূমি সংস্কার কর্মসূচীর সাফল্যের কারণেই পশ্চিমবঙ্গে ১ কোটি ৩৫ লক্ষ একর কৃষিজমির সিংহভাগ গ্রামের গরিব মানুষের হাতে, প্রায় ৮৪ শতাংশ। আর এরসঙ্গেই এসেছে পঞ্চায়েতী রাজযেহেতু গ্রামের গরিবের হাতে জমি, তাইজন্যই সম্ভব হয়েছে গরিব মানুষের হাতে পঞ্চায়েত। এরই ফলে কৃষি উৎপাদনে ব‌্যাপক সাফল্য আমরা অর্জন করেছি। ধান, পাট, আলু, সবজি, ফল,ফুল উৎপাদনে আমরা গোটা দেশে এগিয়ে।  

গণশক্তিঃ ২০০৬ সালে অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের ব‌্যাপকসংখ্যক মানুষের ইতিবাচক রায়ে সপ্তমবারের জন্য পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হলো। কৃষির সাফল্যকে সংহত করে কৃষির ওপর ভিত্তি করে শিল্প গড়ার যে স্লোগানকে মানুষ নির্বাচনে বিপুলভাবে  সমর্থন করলেন, পরবর্তী সময়ে সেই স্লোগান রূপায়ণে এত বাধার সম্মুখীন হতে হলো কেন ?

ভট্টাচার্যঃ ২০০৬ সালের নির্বাচনে কৃষির সাফল্যকে সংহত করে কৃষির ওপর ভিত্তি করে শিল্প গড়ার যে স্লোগান আমরা দিয়েছিলাম, তাতে অবশ্যই মানুষের সম্মতি ছিল। কিন্তু এই উত্তরণটা সহজ ছিল না। বিশেষ করে যাদের জমি হস্তান্তর হবে, তাদের দিক থেকে তো বাধা আসবেই। সেইজন্য জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনের প্রশ্নে আমাদের নীতি আরও স্পষ্ট করা দরকার।

গণশক্তিঃ  রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নের প্রশ্নে বামফ্রন্ট সরকারের আন্তরিক প্রয়াসের সঙ্গে অন্য সবকটি রাজনৈতিক দলের সহমত গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না কেন ? ব‌্যাপকতম জনগণকে সমবেত করার ক্ষেত্রেও কি ঘাটতি থেকে যাচ্ছে না ?

ভট্টাচার্যঃ ভূমি সংস্কার ও কৃষকের হাতে জমি দেওয়ার কর্মসূচী ব‌্যাপক ঐক্যমতের ভিত্তিতেই করা হয়েছে। কারণ এটি জমিদারতন্ত্র বিরোধী ও গণতান্ত্রিক। কিন্তু শিল্পায়ণের ক্ষেত্রে যখন ব্যক্তিগত পুঁজির প্রশ্ন আসছে এবং যার বিকল্প এই মূহুর্তে আমাদের হাতে নেই, সেখানে বিরোধী রাজনৈতিক দল, শরিক দলগুলির মধ্যে বিভ্রান্তি থেকে যাচ্ছে। এই বিভ্রান্তি জনগণের একাংশের মধ্যেও বিস্তৃত হয়েছে। আবার সকলেই বলছেন, আমরাও শিল্পায়ন চাই, কেউই শিল্পায়নের বিরোধী নই। কেবল পথ ও পন্হা নিয়ে বিতর্ক। আলোচনার মধ্যে দিয়েই আমাদের এর মীমাংসায় পৌঁছোতে হবে। ব্যক্তিপুঁজি, বৃহৎ বা বহুজাতিক পুঁজির বিষয়ে শরিকদের দ্বিধা সম্পর্কেও আমরা সচেতন। 

গণশক্তিঃ আপনি বারবারই বলছেন, গরিব মানুষের দিকে লক্ষ্য রেখেই বামফ্রন্ট সরকার তার উন্নয়ন কর্মসূচী পরিচালিত করছে। তা সত্ত্বেও সেই গরিব মানুষের একটি বড় অংশের মধ্যে বামফ্রন্ট সরকারের উন্নয়নের বিকল্প অভিমুখ সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। এক্ষেত্রে দুর্বলতা কোথায় থেকে যাচ্ছে ?

ভট্টাচার্যঃ বামফ্রন্ট সরকারের সব কর্মসূচী রূপায়ণের অভিমুখই হলো রাজ্যের শ্রমজীবী গরিব মানুষ। অন্য রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে আমাদের পার্থক্য এইখানেই। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে বামপন্হী বিকল্প হলোঃ প্রথমত, ভূমি সংস্কার, পঞ্চায়েতী ব্যবস্হা ইত‌্যাদি। দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্হানের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে শিল্পায়ন, বিশেষ করে ম‌্যানুফ‌্যাকচারিং সেক্টর ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া। তৃতীয়ত, সর্বশিক্ষা, সর্বস্বাস্হ্য, স্বনির্ভর গোষ্ঠী, অসংগঠিত শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা ইত‌্যাদি কর্মসূচী। এগুলি হলো আমাদের কাজের অভিমুখ। তবে এটা ঠিক যে  এসব সত্ত্বেও গরিব মানুষের একাংশের কাছে আমরা পৌঁছোতে পারছি না। সরকার, পঞ্চায়েত, পৌরসভা এবং সর্বোপরি পার্টিকে অবশ্যই এই দিকটিতে বিশেষ নজর দিতে হবে।   

গণশক্তিঃ গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে কয়েকটি জেলায় বামফ্রন্টের জনসমর্থন তুলনামূলকভাবে হ্রাস পেয়েছে। কেন এরকম হলো, আপনি কি মনে করেন ?

ভট্টাচার্যঃ পঞ্চায়েত নির্বাচনের ফলাফলের আমরা সামগ্রিক পর্যালোচনা করছি। প্রাথমিক পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, যেসব জেলা বা অঞ্চলগুলিতে আমাদের জনসমর্থন হ্রাস পেয়েছে, সেখানে সাধারণভাবে কয়েকটি কারণ বের হয়ে এসেছে। যেমন, পার্টি ও গণসংগঠনের দুর্বলতা, বামফ্রন্টের শরিক দলগুলির মধ্যে অনৈক্য, বিরোধীদের প্রচারের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রচারের দুর্বলতা, সর্বোপরি জমি অধিগ্রহণ নিয়ে অমূলক আশঙ্কা। এই সমস্ত বিষয়গুলিকে আলোচনা করেই আমাদের পরবর্তী কর্মপদ্ধতি ঠিক করতে হবে।    

গণশক্তিঃ  দার্জিলিঙের সাম্প্রতিক সমস‌্যা  কোন পথে সমাধানের কথা ভাবছেন ?

ভট্টাচার্যঃ দার্জিলিঙ সমস‌্যা সমাধানে আমাদের ধীর-স্হির হয়ে এগোতে হবে। কারণ বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর, এর সঙ্গে জাতিসত্ত্বার প্রশ্ন যুক্ত। আলোচনার মধ্যে দিয়েই আমাদের রাজনৈতিক সমাধানসূত্র বের করতে হবে। পাহাড় ও সমতলে আমরা একসাথেই থাকতে পারি। শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখাই উন্নয়নের পূর্বশর্ত। আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রাখতে হবে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আমরা কেন্দ্রকেও বিষয়টি অবহিত করেছি। আলোচনার মধ্যে দিয়েই এর মীমাংসা করতে হবে।

WORLD FINANCIAL CRISIS

নভেম্বর 23, 2008

WORLD FINANCIAL CRISIS

 

MELTING WORLD

FALLING MARKET

CULLING PEOPLE

JADAVPUR PREVIEW/2006

সেপ্টেম্বর 3, 2008
PREVIEW OF JADAVPUR AC/2006 ASSEMBLY ELECTION

PREVIEW OF JADAVPUR AC/2006 ASSEMBLY ELECTION

WHY THIS INDO-US STRATEGIC ALLIANCE? part 1

সেপ্টেম্বর 3, 2008
PART 1

PART 1

WHY THIS INDO-US STRATEGIC ALLIANCE? part 2

সেপ্টেম্বর 3, 2008
part 2

part 2

দেশের অর্থনীতি কি এবার চলবে ওয়াশিংটন থেকে ?

সেপ্টেম্বর 3, 2008

 

 

 

 

দেশের অর্থনীতি কি এবার চলবে ওয়াশিংটন থেকে ?

অজয় দাশগুপ্ত : পরমাণু চুক্তি থেকে ব‌্যাঙ্ক-বীমা-পেনশন ফান্ড বেসরকারী হাতে তুলে দেওয়াতে বাধা যে একমাত্র বামপন্থীরাই, সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলেন ওয়াল স্ট্রিটের কর্তা থেকে শুরু করে মুম্বাই স্টক এক্সচেঞ্জের মাতব্বররা।

তাই আসলে লড়াইটা শুরু হয়েছিল প্রথম দিন থেকেই। সাধারণ ন্যূনতম কর্মসূচী রূপায়ণের শর্তে বামপন্থীদের সমর্থনে ভারতের সরকার গঠিত হওয়ার সংবাদেই আর্তনাদ উঠেছিল ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে। সরাসরি এমন প্রশ্নও ওরা  তুলেছিল, যে সাধারণ নির্বাচনে ভারতের ‘অর্থনৈতিক সংস্কার’ প্রক্রিয়াই থেমে যাবে, সেই দেশে গণতন্ত্রের মূল্য কী ? ভাবুন একবার, কি সাংঘাতিক ঔদ্ধত্য ! আর সেই প্রেক্ষাপটেই বিদেশী অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলির অঙ্গুলিহেলনে মুম্বাই শেয়ার বাজারের তর্‌ তর্‌ করে নেমে যাওয়া, আতঙ্কিত সোনিয়া গান্ধীর ‘প্রত‌্যাখান’-এর ভাবমূর্তি নির্মাণ যার অবশ্যম্ভাবী ফলশ্রুতিতে  তথাকথিত ‘অর্থনৈতিক সংস্কার’-র গুরু মনমোহন সিং ও ওয়াল স্ট্রিট কর্তাদের ‘চোখের মণি’ মন্টেক-চিদাম্বরম বাহিনীর মসনদে আরোহণের পথ মসৃণ হওয়া।

গত চার বছর তাই লড়াই চলেছে প্রতিদিন, প্রতিমূহুর্তে। ওরা বলেছে, ডি ভি সি, এন টি পি সি-র শেয়ার বাজারে বেচবো। বামপন্থীরা বলেছেন, না, ওগুলো দেশের ‘নবরত্ন’ শিল্প, ওগুলোই যদি দেশী-বিদেশী হাঙরদের বেচে দাও, তবে  আমাদের রইলোটা কী? চিদাম্বরম বললেন, তাহলে টেলিকম আর বিমানবন্দরে ওরা আরো বেশিভাবে ঢুকুক। বামপন্থীরা বললো, সর্বনাশ! তা কি করে হয় ? এগুলো তো দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। ওরা বললো, এত টাকা পেনশন তহবিলে রেখে কি হবে ? এগুলো খাটুক শেয়ার বাজারে। বামপন্থীদের সাবধানবাণী, শ্রমিক-কর্মচারীদের কষ্টার্জিত টাকা এভাবে শেয়ার বাজারে ছিনি-মিনি খেলার জন্য নয়। ওয়াল স্ট্রিটের মুরুব্বিরা চেয়েছে, তাই চিদাম্বরমরা বলেছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক-বীমাশিল্প, গোটা আর্থিক ক্ষেত্রকেই খুলে দেওয়া হোক খোলাবাজারে। সরাসরি আসুক বিদেশী প্রতিষ্ঠানিক সংস্থাগুলো। সংসদ তোলপাড় করে বামপন্থীরা বলেছেন, তাহলে কি দেশের অর্থনীতি এবার চলবে ওয়াশিংটন থেকে ?  সংসদের বাইরে ব‌্যাঙ্ক-বীমাশিল্পের কর্মচারী-অফিসাররা একবাক্যে বলেছেন, মানবো না। যেদিনই সংসদে পেশ হবে এই বিল, সেদিন গোটাদেশে খুলবে না দেশের একটি ব‌্যাঙ্কের দরজাও।

সংঘাত লেগেছে প্রতিনিয়ত। সংঘাত অভিমুখ নিয়ে। বামপন্থীরা বলেছেন, তুমি দেশের সরকার, তুমি কার স্বার্থে চলবে ? দেশের দু’বেলা দু’মুঠো খেতে না পাওয়া ৭০ ভাগ মানুষের স্বার্থে, না স্ত্রীর জন্মদিনে ২৫০ কোটি টাকার জেট বিমান উপহার দেওয়া সেই শিল্পপতির স্বার্থে, যে শিল্পপতির পড়ে পাওয়া ষোলো আনা মুনাফার পাহাড় যাতে আকাশ ছোঁয়, তারজন্য তুমি দু’দিন অন্তর তেলের দাম বাড়িয়েই চলেছো। আর জিনিসের দাম নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য রেশন দোকানগুলোকে চাঙ্গা করতেই তোমার যতো আপত্তি!  খুচরো ব্যবসার জন্য দেশের ৪ কোটি খেটে খাওয়া মানুষের কি হবে, সেকথা একবারও না ভেবে খোদ প্রধানমন্ত্রী  বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের দোরে দোরে দরবার করছেন আমেরিকার দানব বহুজাতিক ‘ওয়াল মার্ট’-এর জন্য! লক্ষ লক্ষ কর্মচারীর তোয়াক্কা না করে মন্টেক সিং আলুওয়ালিয়ার দাওয়াই, সরকারী দপ্তরের ঢালাও আউটসোর্সিং, কর্মসঙ্কোচন, কাজের সুযোগ আরো কমিয়ে দাও। এরকম একটার পর একটা।

বামপন্থীরা মানেনি, যতটা সম্ভব রুখেছে, শেষ পর্যন্ত রোখার চেষ্টা করেছে সংসদের ভেতরে এবং সংসদের বাইরে। বিষয়টা যখন দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীন বিদেশনীতির, তখন বামপন্থীদের কাছে আপসের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এবং আমেরিকার যুদ্ধজোটে ভারতের লেজুড় হওয়াকে স্বাভাবিকভাবেই বামপন্থীরা মেনে নেননি। ইউ পি এ সরকার থেকে সমর্থন প্রত‌্যাহার করেছে বামেরা।

আজ তাই ওরা উল্লসিত! না,কড়া অভিভাবকের হাত থেকে স্কুল পালানো ছেলের মুক্তি এটা নয়, জনতার স্বার্থে লড়াকু প্রতিনিধির ‘কারাগার’ থেকে জনবিরোধী ‘দাগী আসামী’র  মুক্তি!  গত ২৩শে জুলাইতেই চিদাম্বরমের উল্লাস তাই সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে। বণিক সভার বৈঠকে গিয়ে উদাত্ত আশ্বাস, ব‌্যাঙ্ক-বীমা-পেনশন বিল এবার রুখবে কে? সংসদের পরের অধিবেশনেই  ৪০০ জনের বেশি সাংসদের সমর্থন আদায় নাকি তাঁর হাতের মুঠোয়। সাগরপাড়ের কর্তাদের উচ্ছাসও চাপা থাকছে না, খোলাখুলি সংস্কারের ‘স্টিমরোলার’ চালানোর সওয়াল তাদের।

কিন্তু গোড়ায় একটা ওরা গলদ করছেন । আসমুদ্রহিমাচল জনতার অভিমতকে থোড়াই কেয়ার করলে যে তার মাশুল গুণতে হবে, সেটা ওদের ধর্তব্যের মধ্যেই নেই, গত লোকসভা নির্বাচনে বি জে পি-কে যা কড়ায়-গন্ডায় গুণতে হয়েছিল।

মানুষ তাই ফুঁসছেন। বামপন্থীদের নেতৃত্বে গত চার বছর লড়াই তারা করেছেন। লড়াইকে আরো তেজীয়ান, তুঙ্গীয়ান করার সঙ্কল্প নিয়েছেন শ্রমিক-কৃষক-কর্মচারী-ছাত্র-যুব-মহিলা-ক্ষেতমজুর-সংগঠিত ও অসংগঠিত সমস্ত ক্ষেত্রের সংগঠন-গণসংগঠনগুলি। আগামী ২০শে আগস্ট দেশজুড়ে সাধারণ ধর্মঘট সেই লড়াইয়েরই একটা ধাপ। 

 

গণশক্তি, ১১ই আগস্ট, ২০০৮, প্রথম কলম

মাহমুদ দারবিশ ( ১৩ই মার্চ, ১৯৪১- ৯ই আগস্ট, ২০০৮)

সেপ্টেম্বর 3, 2008

আপস ছিল তাঁর নাপসন্দ

অজয় দাশগুপ্ত

 

হিউস্টনের হাসপাতালে ওপেন হার্ট সার্জারি করার আগে একটি বন্ডে তিনি লিখে দিয়েছিলেন, ‘যদি আমার মস্তিষ্কের মৃত্যু ঘটে, তৎক্ষণাৎ যেন অক্সিজেনের নলটাও খুলে দেওয়া হয়।’ ঠিক এই একটি ঘটনা দিয়েই ব্যক্তি দারবিশকে, তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে চেনা যায়। জীবন্মৃত হয়ে তিনি কোনোদিনও বেঁচে থাকতে চাননি।

মাহমুদ দারবিশ আরব দুনিয়ায় প‌্যালেস্তাইনের জাতীয় কবিহিসেবেই বিবেচিত হতেন। ৩০টির বেশি কবিতার বই, আর ৮টি গদ্য গ্রন্থের প্রণেতা এই কবি মাতৃভূমি প‌্যালেস্তাইনের প্রতি তাঁর গভীর আবেগের জন্য সুপরিচিত ছিলেন কিন্তু শুধু ‘কবি’, এই পরিচয়েই দারবিশকে সীমাবদ্ধ রাখা অন‌্যায় হবে। কারণ প‌্যালেস্তাইনের মানুষের অবরুদ্ধ ভাষাকে তিনি মূর্ত করেছেন কবিতায়, আকার দিয়েছেন তাঁদের আত্মোপলব্ধিকে।

তাই হাজারো মানুষের ভিড়ে তাঁর কবিতার নির্ঘোষ, কবিতার পংক্তি ডানা মেলেছে সুরের, হয়ে উঠেছে গান। দারবিশের কবিতার লাইন জেগে উঠেছে গাজা ভূখন্ডের বাসিন্দা আরব রমণীর সূচীকর্মে, তরুণ প‌্যালেস্তিনীয়ের টি-শার্টে লোগো হয়ে জোরালো করেছে জায়নবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষাকে।   

১৯৪১ সালের ১৩ মার্চ বর্তমান উত্তর ইজরায়েলের গ‌্যালিলি অঞ্চলে হাইফার কাছে আল-বিরওয়া নামে একটি আরব গ্রামে দারবিশের জন্ম। ১৯৪৮ সালের আরব-ইজরায়েল যুদ্ধে তাঁদের পুরো গ্রামই ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। শৈশবেই বাস্তুহারা হন তিনি। পরে আবার ফিরে এলেও ১৯৭০ সালে  অধিকৃত প‌্যালেস্তাইনে তাঁর ঢোকায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। দীর্ঘ ২৬ বছরের কিছু সময়  মস্কোতে বাদ দিলে কখনো কায়রো, কখনো বেইরুট, কখনো বা টিউনিস, বিভিন্ন আরব দেশের রাজধানী শহরেই ছিল তাঁর নির্বাসনের জীবন এমনকি তাঁর মা যখন মৃত্যুশয‌্যায়, তখনও শেষকৃত্যের জন্য কিছু সময় বাদ দিলে গ‌্যালিলিতে গিয়ে দেখার অনুমতি তাঁকে দেওয়া হয়নি। জীবনের উপান্তে এসে তিনি অনুমতি পান প‌্যালেস্তাইনে বাস করার। ১৯৯৬ সালে জর্ডন নদীর পশ্চিম তীরে(ওয়েস্ট ব‌্যাঙ্ক) রামাল্লা শহরে গিয়ে বসবাস শুরু করেন দারবিশ।

১৯৬০ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ পাখ্‌হীন পাখি‘ (উইংলেস্‌ বার্ড) প্রকাশের মধ্য দিয়ে আরব সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করেন তিনি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব এবং নিবার্সিত জীবনের যন্ত্রণা তাঁর ক্ষুরধার লেখনীতে ভাষা পেয়েছে সবসময়। ১৯৮২ সালে বেইরুটে থাকার সময় লেবাননে ইজরায়েলী আক্রমণ এবং বোমাবর্ষণের সময় তিনি লিখছেনঃ

‘‘ এই সেই রাস্তা,

আর এখন ঘড়িতে সন্ধ‌্যা ৭টা।

দিগন্ত যেন ইস্পাত বলয়।

আমার নিষ্পাপ আবেগের কথা

আমি এখন কাকে বলবো ?…

এই রাস্তায় এমন আস্তে হাঁটছি

যেন একটা জেট বিমানও

আমাকে বোমার লক্ষ্য হিসাবে ভুল না করে।

শুন্যতা তার করাল বিস্তৃত করেছে,

কিন্তু তাও আমাকে গ্রাস করলো না।

লক্ষ্যহীনভাবে এগিয়ে চলেছি,

যেন এই রাস্তাগুলোকে আমি

প্রথমবার চেনার চেষ্টা করছি

এবং শেষবারের মতো হেঁটে চলেছি।

——‘‘মেমোরি ফর ফরগেটফুলনেস’’ 

 

গভীর পর্যবেক্ষণশক্তির অধিকারী এই কবি পরিণত হয়েছিলেন পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমে প‌্যালেস্তাইনের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রতীকে আরবি ভাষায় লেখালেখি করলেও ইংরেজি , হিব্রু ও ফরাসি ভাষায় বাক্যালাপের দক্ষতা দারবিশের ছিল। তাঁর লেখনী এবং রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় উপস্থিতির মধ্য দিয়ে প‌্যালেস্তাইনের  স্বাধীনতা আন্দোলনের বিষয়ে উচ্চকন্ঠ তিনি ইজরায়েলী দখলদারির তীব্র বিরোধিতার পাশাপাশি তিনি সবসময়ই প‌্যালেস্তাইনের রাজনীতিতে ঐক্যের প্রশ্নে সোচ্চার ছিলেন। স্বাধীন প‌্যালেস্তাইনের লক্ষ্যে  সংগ্রামরত হামাস এবং ফাতাহ্‌ গোষ্ঠীর মধ্যে অন্তর্কলহের তীব্রবিরোধী ছিলেন তিনি। একসময়ে ইজরায়েলের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য দারবিশ প‌্যালেস্তাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন বা পি এল ও-র কার্যকরী কমিটিতেও ছিলেন। স্বাধীন প‌্যালেস্তাইনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে ১৯৮৮ সালে প‌্যালেস্তাইনের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি ছিল মাহমুদ দারবিশেরই লেখা। সেইসময় প‌্যালেস্তাইনের স্বাধীনতা আন্দোলনের অবিসংবাদী নেতা ইয়াসের আরাফত বিশাল এক রাজনৈতিক সমাবেশে  ওই স্বাধীনতার একতরফা ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেছিলেন। কিন্তু ১৯৯৩ সালে ইয়াসের আরাফত ইজরায়েলের সঙ্গে অস্‌লোতে অর্ন্তবর্তীকালীন শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করায় পি এল ও থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। কারণ তিনি মনে করতেন এরফলে আপস করা হচ্ছে।

মৃত্যুর আগে দারবিশ রামাল্লাতেই সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা জানিয়ে গেছেন। কারণ স্বাধীনতার অদম্য আকাঙ্ক্ষা থেকেই তিনি চাননি অধিকৃত প‌্যালেস্তাইনে তাঁর শেষকৃত্য হোক। 
 
 

 

গণশক্তি, ১৬ই আগস্ট,২০০৮। ajoy_dasgupta@hotmail.com

 
 
 

 

মাহমুদ দারবিশের কবিতা

সেপ্টেম্বর 3, 2008

অজয় দাশগুপ্ত | ১৬ অগাস্ট ২০০৮ ১:১২ পূর্বাহ্ন

১৯৮২ সালে ইজরায়েল যখন লেবাননে আক্রমণ হানে, তখন বেইরুটে নির্বাসিতের জীবন কাটাচ্ছিলেন মাহমুদ দারবিশ। ইজরায়েলি বিমান থেকে এক সন্ধ্যায় বেইরুটে কয়েক পশলা বোমাবর্ষণের পর দারবিশের কলম থেকে বেরিয়ে আসে এই কবিতাটি।

বিস্মৃতির স্মৃতি

এই সেই রাস্তা,
আর এখন ঘড়িতে সন্ধ্যা ৭টা।
দিগন্ত যেন ইস্পাত বলয়।
আমার নিষ্পাপ আবেগের কথা
আমি এখন কাকে বলবো?

এই রাস্তায় এমন আস্তে হাঁটছি
যেন একটা জেট বিমানও
আমাকে বোমার লক্ষ্য হিসাবে ভুল না করে।
শূন্যতা তার করাল বিস্তৃত করেছে,
কিন্তু তাও আমাকে গ্রাস করলো না।
লক্ষ্যহীনভাবে এগিয়ে চলেছি,
যেন এই রাস্তাগুলোকে আমি
প্রথমবার চেনার চেষ্টা করছি
এবং শেষবারের মতো হেঁটে চলেছি।

Hello world!

সেপ্টেম্বর 3, 2008

Welcome to WordPress.com. This is your first post. Edit or delete it and start blogging!